‎এই পৃথিবীর ব্যস্ততা, কোলাহল আর দুঃখ-কষ্টের মাঝে আমরা সবাই একটি আশ্রয় খুঁজে ফিরি। এমন একটি জায়গা, যেখানে কোনো দুশ্চিন্তা নেই, কোনো অভাব নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। যেখানে কেবলই শান্তি আর আনন্দ। সেই চিরস্থায়ী শান্তির ঠিকানা হলো জান্নাত। কিন্তু কেন সবাই জান্নাতে যেতে চায়? জান্নাত কেমন হবে? কী আছে সেই পরম সুখের আবাসে? আজকের এই ভিডিওতে আমরা জান্নাতের এমনই সব অবিশ্বাস্য বর্ণনা তুলে ধরব, যা শুনে আপনার মন ভরে যাবে।"

‎"জান্নাত, আরবি শব্দ যার অর্থ বাগান বা উদ্যান। ফার্সি ভাষায় একে বলা হয় বেহেশত। এটি সেই চিরস্থায়ী সুখের আবাস, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক বান্দাদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। এই জান্নাত এমন এক বাসস্থান, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানব হৃদয় কল্পনাও করতে পারেনি। আল্লাহ বলেন, 'আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী হবে। তারা সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে।' (সূরা বাকারা: ৮২)"

‎ "ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন, 'রাসূল (সা.) বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর মাখলুক, তা কখনো ধ্বংস হবে না এবং ক্ষয় হবে না।'" (সহিহুল জামি)। "এই জান্নাত কোনো অস্থায়ী ঠিকানা নয়, বরং এটি চিরস্থায়ী। জান্নাতিরা সেখানে অনন্তকাল ধরে অবস্থান করবে।"

‎কেয়ামতের দিন যখন জান্নাতিরা জান্নাতের দরজায় পৌঁছাবে, তখন তারা সেখানে এক ভিন্ন জগতের সন্ধান পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত, তাদের জন্য জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে এবং তার দ্বাররক্ষীরা তাদের বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম (শান্তি), তোমরা পবিত্র। এখন তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর, তাতে চিরস্থায়ী থাকার জন্য।' (সূরা যুমার: ৭৩)"

‎ "জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দরজা দিয়ে নেক আমল অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দল প্রবেশ করবে। যেমন, সালাতের দরজা, জিহাদের দরজা, সাদাকার দরজা এবং সিয়ামের দরজা। সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যার নাম 'রায়্যান'।"

‎ "যারা সালাতের প্রতি যত্নবান, তারা সালাতের দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা জিহাদের দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আর যারা রোজা রেখেছে, তাদের জন্য আছে রায়্যান নামক দরজা।"

‎জান্নাতে মানুষের আমল ও মর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর রয়েছে। হাদিস অনুযায়ী, মুজাহিদদের জন্য একশটি স্তর রয়েছে। তবে, সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে জান্নাতের অসংখ্য স্তর রয়েছে এবং প্রতিটি স্তরের মাঝে আকাশ ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান ব্যবধান থাকবে। পবিত্র কোরআনে জান্নাতের আটটি বিশেষ স্তরের নাম পাওয়া যায়, যেমন: জান্নাতুল ফিরদাউস, জান্নাতুল আদন, জান্নাতুন নাঈম, দারুস সালাম, জান্নাতুল মাওয়া, দারুল কারার, জান্নাতুল খুলদ এবং দারুল মুকামাহ। এই স্তরগুলোর মধ্যে জান্নাতুল ফিরদাউস হলো সবচেয়ে উচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্তর। আল্লাহ বলেছেন, 'যদি জান্নাত চাও, তবে আল-ফিরদাউস চাও, কারণ তা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর এবং সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয়েছে। তার উপরেই রয়েছে রহমানের আরশ।' 


‎"জান্নাতে মানুষ কখনো বৃদ্ধ হবে না, তাদের শরীর দুর্বল হবে না এবং তাদের চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। জান্নাতে প্রবেশ করার পর সবার বয়স হবে ৩৩ বছর। তারা চিরকাল এই বয়সেই থাকবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, 'জান্নাতের অধিবাসীরা বিনা লোমশ, দাড়িবিহীন যুবক হবে, যাদের চোখে সুরমা থাকবে। তাদের যৌবন কখনো শেষ হবে না।' (তিরমিজি, হাদিস: ২৫৪৫) শুধু তা-ই নয়, জান্নাতিদের উচ্চতাও হবে বিশেষ ধরনের। হাদিসে এসেছে, সবাই জান্নাতে আদম (আঃ)-এর আকৃতিতে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ তাদের উচ্চতা হবে ৬০ হাত বা প্রায় ৩০ মিটার।"

‎ "জান্নাতের মাটি কেমন? হাদিসে এসেছে, জান্নাতের মাটি হবে মিশকের। আর তার একটি ইট হবে রুপার, আরেকটি হবে সোনার। তার গাঁথুনি হবে সুগন্ধময় মিশকের। আর নুড়িগুলো হবে মুক্তা ও ইয়াকুতের।" (তিরমিজি, হাদিস: ২৫২৬)

‎ "জান্নাতের প্রাসাদ ও ঘরগুলো হবে অতুলনীয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, 'জান্নাতে এমন কক্ষ আছে, যার বাহিরের অংশ ভিতর থেকে এবং ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে।' সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! এই কক্ষগুলো কার জন্য?' তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি উত্তম কথা বলে, অন্নদান করে এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ পড়ে, তার জন্য।" (ত্বাবারানী, হাকেম)

‎"মু'মিনদের জন্য একটি শূন্যগর্ভ মুক্তার তাঁবু থাকবে, যার দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। এর মধ্যে মু'মিনদের জন্য একাধিক স্ত্রী থাকবে। তারা সেখানে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে।" (বুখারি, মুসলিম)

‎"জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতিদের প্রথম খাবারটি হবে খুবই বিশেষ। রাসূল (সা.) বলেছেন, 'জান্নাতিদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩১৪৭) এই খাবারটি খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর হবে। এর পর তাদের দ্বিতীয় খাবার দেওয়া হবে। সহিহ মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, 'এর পরে জান্নাতিদের খাবার হিসেবে এমন একটি ষাঁড়ের মাংস দেওয়া হবে, যা জান্নাতের বাগানগুলোতে চরে বেড়াতো।'"

‎ "জান্নাতের অন্যতম বড় নিয়ামত হলো তার নদী ও ঝর্ণা। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'মুত্তাকিদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তার অবস্থা হলো, তাতে রয়েছে এমন সব পানির নদী, যা কখনো দুর্গন্ধযুক্ত হবে না, এমন দুধের নদী, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তিত হবে না, এমন মধুর নদী, যা অতি পবিত্র এবং এমন মদের নদী, যা পানকারীদের জন্য অতি সুস্বাদু।' (সূরা মুহাম্মাদ: ১৫)

‎ "জান্নাতে তাসনীম ও সালসাবীল নামের ঝর্ণা থাকবে, যা থেকে পবিত্র পানীয় সরবরাহ করা হবে। জান্নাতের ফলমূল ও শস্য পৃথিবীর মতো নয়। আল্লাহ বলেন, 'সেখানে প্রচুর ফলমূল থাকবে, যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না।' (সূরা ওয়াকিয়া: ৩২-৩৩) একটি হাদিসে এসেছে, উড়ন্ত পাখির প্রতি নজর দিলে এবং খাওয়ার ইচ্ছে করলে তা রান্না হয়ে সামনে হাজির হয়ে যাবে।

‎ "জান্নাতী নারী-পুরুষদের পোশাক হবে মিহি সবুজ এবং মোটা রেশমী কাপড়ের। তারা অলঙ্কৃত হবে স্বর্ণ ও মুক্তার কঙ্কনে। আল্লাহ বলেন, 'তাদের দেহে হবে মিহি সবুজ এবং মোটা রেশমী কাপড়, তারা অলঙ্কৃত হবে রৌপ্য-নির্মিত কঙ্কনে, আর তাদের প্রতিপালক তাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়।' (সূরা দাহর: ২১)

‎ "জান্নাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো তার সঙ্গীরা। জান্নাতিরা তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সাথে একত্রিত হবে, যারা ঈমান এনেছিল। এছাড়াও, তাদের জন্য থাকবে পবিত্র সঙ্গী, হুর। আল্লাহ বলেন, 'আর তাদের বিবাহ দেওয়া হবে ডাগরচোখ বিশিষ্ট হুরদের সঙ্গে।' (সূরা আত-তূর: ২০)

‎ "জান্নাতিদের খাবার ও পানীয়ের অভাব হবে না। আল্লাহ বলেন, 'সেখানে মন যা চাইবে তাই তোমাদের জন্য রয়েছে এবং তোমরা যা দাবি করবে তাও তোমাদের দেওয়া হবে।' (সূরা হামিম আস-সাজদা: ৩১) জান্নাতের সুরা পান করলে নেশা হবে না, বরং তা মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল করবে।"

‎ষষ্ঠ অধ্যায়: জান্নাতের সর্বোচ্চ নিয়ামত: আল্লাহর দর্শন (২৪:০০ - ২৭:০০)

‎ "জান্নাতের সকল নিয়ামতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো আল্লাহ তাআলাকে দর্শন করা। জান্নাতিরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর দীদার লাভ করবে। আল্লাহ বলেন, 'সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।' (সূরা কিয়ামাহ: ২২-২৩)

‎ "রাসূল (সা.) বলেন, 'তোমরা যেভাবে এই চাঁদকে দেখছ, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, সেভাবেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখবে।' (বুখারী, মুসলিম) এই দর্শনই হবে জান্নাতী জীবনের চূড়ান্ত তৃপ্তি।"

‎ "জান্নাত এমন এক আবাস, যা পাওয়ার জন্য মু'মিনরা জীবন উৎসর্গ করে। এটি শুধু একটি বাসস্থান নয়, এটি আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য। তাই আসুন, সেই জান্নাত লাভের জন্য আমরা কিছু সহজ আমল করি।"

‎ জান্নাতে যাওয়ার সহজ উপায়ঃ

‎১. সালামের প্রচার: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না ঈমান আনো। আর তোমরা মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছু বলে দেব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচার কর।' (মুসলিম, হাদিস: ৫৪)

‎২. ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশে মৃত্যুর ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।' (নাসায়ী, হাদিস: ৯৯২৮)

‎৩. এতিমের দেখাশোনা: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'আমি এবং এতিমের দেখাশোনাকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।' এরপর তিনি নিজের শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন। (বুখারী, হাদিস: ৫৩০৪)

‎৪. উত্তম কথা বলা ও অন্নদান করা: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'জান্নাতে এমন কক্ষ আছে, যার বাহিরের অংশ ভিতর থেকে এবং ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে। যে ব্যক্তি উত্তম কথা বলে, অন্নদান করে ও লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ পড়ে, তার জন্য।' (ত্বাবারানী, হাকেম)

‎৫. জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা: রাসূল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা করবে। কারণ তা জান্নাতের মধ্যবর্তী এবং সর্বোচ্চ জান্নাত। সেখান থেকেই জান্নাতের নদীসমূহ প্রবাহিত হয়।' (বুখারী, হাদিস: ২৭৯০)

‎ "আপনারা নিয়মিত এই আমলগুলো করার চেষ্টা করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাদের সকলের শেষ ঠিকানা যেন জান্নাতুল ফিরদাউস হয়। ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক ও শেয়ার করবেন। এমন আরও ইসলামিক ভিডিও পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন। ধন্যবাদ!"

Comments

Popular posts from this blog